তীব্র দাবদাহেও গণতান্ত্রিক দায়িত্বে অটল—নদীয়ায় পোস্টাল ব্যালটে ভোট কর্মীদের নজিরবিহীন ভিড়

নিজস্ব সংবাদদাতা, নদীয়া:
প্রচণ্ড গরমে যখন সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়, ঠিক সেই সময়ই গণতান্ত্রিক দায়িত্ব পালনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন নদীয়ার ভোট কর্মীরা। রবিবার জেলা জুড়ে শুরু হয়েছে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া, আর তাতেই দেখা গেল অভূতপূর্ব সাড়া। প্রখর রোদ উপেক্ষা করে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিলেন শতাধিক কর্মী, যা কার্যত এক বিরল নজির হয়ে উঠেছে।
জেলার শান্তিপুর, কৃষ্ণনগর, রানাঘাট, ধুবুলিয়া, কল্যাণী ও তেহট্ট—একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে এই বিশেষ ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে শান্তিপুর ব্লকের ফুলিয়া বালিকা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণেই সবচেয়ে বেশি ভিড় লক্ষ্য করা যায়। এখানে মোট ১২৭৫ জন ভোট কর্মী অংশগ্রহণ করেন। সকাল থেকেই কেন্দ্রে কর্মীদের লম্বা লাইন চোখে পড়ে, অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, এই পোস্টাল ব্যালট সাধারণ ভোটারদের জন্য নয়, বরং আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ভোট কর্মীদের জন্যই এই বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। নির্বাচনকালে দায়িত্ব পালনের কারণে তাঁরা যাতে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, সে কারণেই এই উদ্যোগ। অনেক কর্মীর কাছেই এটি ছিল প্রথম অভিজ্ঞতা। ফলে দায়িত্ববোধের পাশাপাশি নতুন অভিজ্ঞতার উচ্ছ্বাসও স্পষ্ট ছিল তাঁদের মধ্যে।
জেলা প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, গোটা প্রক্রিয়াটি দু’দিন ধরে চলবে। প্রথম দিনে দুটি ধাপে মোট ৮৬১ জন কর্মীর ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়—প্রথম ধাপে ৪৩২ জন এবং দ্বিতীয় ধাপে ৪২৯ জন। দ্বিতীয় দিনে আরও ৪১৪ জন কর্মীর ভোট গ্রহণ করা হবে। শুধুমাত্র শান্তিপুর বিধানসভা কেন্দ্রেই এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, যাতে ভোটগ্রহণ নির্বিঘ্ন ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়।
অন্যদিকে রানাঘাট মহকুমা অঞ্চলেও একইভাবে জোরকদমে চলছে পোস্টাল ব্যালটের ভোটগ্রহণ। রানাঘাট পাল চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়, ব্রজবালা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় এবং দেবনাথ ইনস্টিটিউশন—এই তিনটি কেন্দ্রে সকাল থেকেই কর্মীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রতিটি কেন্দ্রেই কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মোতায়েন রয়েছে রাজ্য পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী, যাতে কোনওরকম বিশৃঙ্খলা না ঘটে।
তবে শুরুটা একেবারেই মসৃণ ছিল না। নির্ধারিত সময়ে ভোটগ্রহণ শুরু না হওয়ায় প্রথমদিকে ক্ষোভে ফেটে পড়েন অনেক ভোট কর্মী। তীব্র গরমে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হওয়ায় তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা যায়। কেউ কেউ প্রশাসনিক গাফিলতির অভিযোগও তোলেন। যদিও পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয় এবং ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া গতি পায়।
শান্তিপুরের সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক জানিয়েছেন, “সমস্ত দিক খতিয়ে দেখে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েই ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হয়েছে। নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সবরকম ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।”
সব মিলিয়ে, প্রখর দাবদাহের মধ্যেও ভোট কর্মীদের এই ব্যাপক অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের প্রতি তাঁদের দায়বদ্ধতারই এক উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে উঠে এসেছে। নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে যাঁরা দায়িত্বে রয়েছেন, তাঁরাই নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগে এমন আগ্রহ দেখানোয় প্রশাসনও আশাবাদী—আসন্ন নির্বাচনী প্রক্রিয়াও একইভাবে সফলভাবে সম্পন্ন হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *